ব্যাটল অফ মারাশঃ তুর্কি স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রথম সংগ্রাম

১৯১৯ সালের ১৯ মে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের দামামা বন্ধ হলেও আগুন জ্বলছে তুর্কিদের হৃদয়ে। নিভু নিভু হয়ে জ্বলছে অটোমান বাতি। তাদের বিশাল সাম্রাজ্যকে ভেঙ্গে টুকরো টুকরো করা হয়েছে । ডুবে গেছে খেলাফতের শেষ সূর্য। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অক্ষশক্তিতে যোগ দেয়ার ভুল সিধান্তের খেসারত দিচ্ছে সাধারণ তুর্কি নাগরিকরা। পুরো দেশে এখন আসলে কে ক্ষমতায় আছে তা বুঝা মুশকিল। পশ্চিমে গ্রিস, পূর্বে আর্মেনিয়া, দক্ষিণে ফ্রান্স, রাজধানী ইস্তাম্বুলসহ আশেপাশের অঞ্চলে ব্রিটিশ-ইতালিয়ান যৌথ শাসন ছাড়াও বিচ্ছিন্নতাবাদী ও অটোমান অভিজাতদের দখলে বিভিন্ন শহর ভাগ হয়ে গেছে। এরই মধ্যে শুরু হয় তুর্কিদের স্বাধীনতা যুদ্ধ। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে লজ্জাজনক পরাজয়ের পর আনাতোলিয়াসহ বিভিন্ন অঞ্চলের জেনারেলগণ অটোমান সুলতান ষষ্ঠ মেহমুদ কিংবা মিত্রবাহিনী – কারো কথাই যখন শুনছিল না, তখন তুর্কি সেনাবাহিনীর সর্বজন শ্রদ্ধেয় জেনারেল মোস্তফা কামাল পাশাকে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে দায়িত্ব দেয়া হয়। কিন্তু পরিস্থিতির মারপ্যাঁচে ও বিভিন্ন ঘটনা পরম্পরায় তিনিই হয়ে উঠেন তুর্কি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের প্রধান নেতা। এরই মধ্যে আনাতোলিয়া ও ইজমির দখল করতে গ্রিস সরকার সেনাবাহিনী প্রেরণ করে। ফলে শুরু হয় তুর্কি স্বাধীনতার সশস্ত্র যুদ্ধ।

মিত্রবাহিনীর পুতুল অটোমান সরকারের বিরুদ্ধে Grand National Assembly (GNA) নামে পাল্টা সরকার গঠন করেন কামাল পাশা । ফলে মিত্রবাহিনী অটোমানদের সংবিধান বাতিল করে Treaty of Sèvres নামক লজ্জাজনক চুক্তি করতে সুলতানকে চাপ দেয়। এরই মধ্যে জেনারেল কাজিম কারাবেকের পাশার বাহিনী দক্ষিণের ফ্রেঞ্চ বাহিনীকে পরাজিত করে সন্ধি করতে বাধ্য করে। জেনারেল ইসমেত পাশা প্রথমে গ্রিকদের বিরুদ্ধে পরাজিত হলে তার সাহায্যে এগিয়ে আসেন কামাল পাশা। তিন দফা ভয়াবহ যুদ্ধের পর গ্রিকরাও পিছু হটে। ১৯২৩ সালের জুলাই নাগাদ বেশিরভাগ অঞ্চলে কামাল পাশার জিএনএ সরকারের নিয়ন্ত্রণ এসে যায়। ফলে মিত্রবাহিনী এবার সেই সরকারকে স্বীকৃতি দিতে বাধ্য হওয়ার পাশাপাশি Treaty of Lausanne চুক্তি করে যা আগের চুক্তির চেয়ে বেশ সম্মানজনক এবং বেশি পরিমাণে তুর্কি স্বার্থ সংরক্ষনকারী। চুক্তি অনুযায়ী মিত্রবাহিনী দেশ ছেড়ে চলে গেলে তাদের পুতুল অটোমান সরকারকে উৎখাত করে মোস্তফা কামাল পাশা গণপ্রজাতন্ত্রী তুরস্কের ঘোষণা দেন। এভাবেই শেষ হয়ে তুর্কিদের ৪ বছরের বেশি সময় জুড়ে চলা স্বাধীনতা যুদ্ধ।

ছবিঃ দুটো চুক্তিতে প্রস্তাবিত তুরস্কের ম্যাপ যেমন

আজকের আর্টিকেলে আমরা যে যুদ্ধ সম্পর্কে জানতে যাচ্ছি তা তুরস্কের স্বাধীনতা যুদ্ধের প্রথম বড় ধরণের যুদ্ধ। ব্যাটল অফ মারাশ (তুর্কি ভাষায় Maraş Muharebesi) ১৯২০ সালের ২১ জানুয়ারি থেকে শুরু হয়ে ১৩ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত চলে। মারাশ শহরটি বৃহত্তর অটোমান সাম্রাজ্যের আলেপ্পো ভিলায়েতের অন্তর্গত একটি শহর। ভুমধ্যসাগরের তীরে অবস্থিত হওয়ায় এটি কৌশলগত দিক দিয়ে বেশ গুরুত্বপূর্ণ ছিল। বর্তমানে এটি অফিশিয়ালভাবে Kahramanmaraş প্রদেশের অন্তর্গত। তুর্কি ভাষায় kahraman শব্দের অর্থ hero। ব্যাটল অফ মারাশে তুর্কি সেনাদের বীরত্বের কারণে এই নামকরণ করা হয়েছে। চলুন দেখে নেয়া যাক দুই পক্ষের শক্তিমত্তা কেমন ছিল।

সামরিক শক্তিমত্তাঃ

আগেই বলেছি যে অটোমান সাম্রাজ্যের দক্ষিণ অংশ ফ্রান্স ভাগে পেয়েছিল। মারাশের যুদ্ধে এক পক্ষে ছিল Turkish National Movement এর সামান্য ট্রেইনিংপ্রাপ্ত মিলিশিয়া যোদ্ধা। অপরপক্ষে সুপ্রশিক্ষিত ফরাসী সেনা ছাড়াও ফ্রেঞ্চ-আর্মেনিয়ান লিজিয়নের যোদ্ধারা। ফ্রেঞ্চদের নেতৃত্বে ছিলেন জেনারেল Quérette, লেফটেন্যান্ট কর্নেল Robert Normand সহ প্রমুখ এবং তুর্কিদের পক্ষে Arslan Bey, Kılıç Ali Bey সহ প্রমুখ। দুই পক্ষের সেনাসংখ্যা নিয়ে বিভ্রান্তিমূলক তথ্য পাওয়া যায়। ফ্রেঞ্চদের দাবি অনুযায়ী তুর্কি গেরিলাদের সংখ্যা ছিল ত্রিশ হাজার। যদিও তুর্কি সুত্র অনুযায়ী সংখ্যাটি মাত্র আড়াই হাজার। তবে তাদের সঙ্গে স্থানীয় মানুষের সহায়তা ছিল। অন্যদিকে ফ্রেঞ্চরা এই যুদ্ধে নিজেদের প্রকৃত সংখ্যা প্রকাশ করেনি। আর করবেই বা কেন? অপ্রশিক্ষিত একটি বাহিনীর কাছে হেরে পিছু হটা তো গৌরবের নয়। তুর্কি ভাষ্যমতে ফ্রেঞ্চরা ছিল সংখ্যায় তিন হাজার। এদের সঙ্গে ছিল প্রায় দু হাজার আর্মেনিয়ান। তবে এদের বেশিরভাগই নিরস্ত্র বেসামরিক ব্যক্তি ছিল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় গণহত্যার ভয়ে প্রায় দেড় লাখ আর্মেনিয়ান এই অঞ্চলে পালিয়ে এসেছিল। পশ্চিমা অন্যান্য সোর্স মোতাবেক ফ্রেঞ্চদের পাশাপাশি আফ্রিকার ফরাসি উপনিবেশ সেনেগালের কিছু সৈনিক ছিল। তবে সংখ্যাটি চার হাজারের বেশি নয়। এছাড়া ফ্রেঞ্চদের আর্মার্ড কার ও কিছু আর্টিলারি ছিল।

ছবিঃ সৈন্যদের প্রস্তুতি পর্যবেক্ষণ করছেন কামাল পাশা

মারাশ যুদ্ধের আগের কিছু রাজনৈতিক ঘটনা না বললেই নয়। এর পাশের অঞ্চল সিলিসিয়া দখলের জন্য ব্রিটিশ-ফ্রেঞ্চদের অলিখিত প্রতিযোগিতা চলছিল। এরই মধ্যে ব্রিটিশ পার্লামেন্ট অঞ্চলটি ফ্রেঞ্চদের দিয়ে দেয়। এর ফলে ফিল্ড মার্শাল ফার্ডিনান্ডের দেয়া ৩২টি পদাতিক ব্যাটালিয়ন, ২০টি ক্যাভিলারি স্কোয়াড্রন, ১৪টি আর্টিলারি রেজিমেন্ট মারাশে স্থাপনের পরিকল্পনা ভেস্তে যায়। এতে ফ্রেঞ্চদের মারাত্মক অস্ত্র সংকট দেখা দেয়। তাদের কাছে পর্যাপ্ত মেশিনগান, যুদ্ধবিমান, হেভি আর্টিলারি, ওয়্যারলেস ট্রান্সমিটার এমনকি বার্তা আদানপ্রদানের প্রশিক্ষিত কবুতরের সংকট ও দেখা দেয়। জেনারেল মোস্তফা কামাল পাশা বিষয়টি জানতে পেরে অবিলম্বে ফ্রেঞ্চ গ্যারিসনগুলোকে অবরোধ দিতে ক্যাপ্টেন আলী কিলিক কে অর্ডার দেন। আলী ছিলেন বেশ চতুর। তিনি স্থানীয় গেরিলাদের সংগঠিত করার পাশাপাশি আর্মেনিয়ানদের সম্পদ দখল করা তুর্কিদের সাহায্য চান। তারাও জানতো যে কামাল পাশা ক্ষমতায় না আসলে আর্মেনিয়ানদের সম্পত্তি একদিন ফেরত দিতে হবে। তাদের ব্যাপক লজিস্টিক সাপোর্ট পেয়ে তুর্কি ন্যাশনালিস্ট মুভমেন্টের সেনারা ব্যাপক অবরোধ শুরু করেন। তবে তাদের অস্ত্রশস্ত্র ছিল প্রয়োজনের তুলনায় একেবারেই অপ্রতুল। বেশিরভাগ রাইফেল প্রথম বিশ্বযুদ্ধের যুগের চেয়েও পুরনো হান্টিং রাইফেল। দেড় হাজার সৈন্যের উল্লেখযোগ্যদের হাতে অস্ত্র বলতে ছুরি বা ছোট তলোয়ার ছিল। যুদ্ধের আগে একটি ফ্রেঞ্চ গ্যারিসন থেকে ৮৫০ রাইফেল, দুটি ক্যানন, দুটি মেশিনগান তুর্কিদের হস্তগত হয়েছিল।

ছবিঃ শিল্পীর চোখে তুর্কি বাহিনীকে স্বাগত জানাচ্ছে স্থানীয়রা

অপরদিকে ফ্রেঞ্চ বাহিনীতে তখন একের পর এক সমস্যা দেখা দিচ্ছিলো। বিক্ষুব্ধ আর্মেনিয়ানদের একটি অংশ জানুয়ারি মাস থেকেই ফ্রেঞ্চ সাপ্লাই কনভয়ে হামলা করে লুটপাট করছিলো। আবার কুর্দি, সিরকাসিয়ান, আলেভিস নামের ক্ষুদ্র জাতিসত্ত্বার জনগণ তুর্কি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনকে সমর্থন দিচ্ছিলো। এদেরকে শান্ত করতে ফরাসিরা নতুন একটি আধা সামরিক বাহিনী গঠন করে। এদের মধ্যে আলজেরিয়ান ফ্রেঞ্চ নাগরিক ও ছিল। এরা স্থানীয়দের মধ্যে লুটপাট, মারধর, জোর জবরদস্তি চালাতো যা ফ্রেঞ্চ ইউনিফর্মের প্রতি জনগণের ঘৃণা বাড়িয়ে দেয়। এসব কারণে ফ্রেঞ্চ হাইকমান্ড দ্রুত জেনারেল কিউয়েরেট্টে কে রিএনফোর্সমেন্ট হিসেবে পাঁঠিয়ে ঐ অঞ্চলে প্রকৃত ফ্রেঞ্চ সেনাদের উপস্থিতি বৃদ্ধি করে। এদের সাপ্লাই কনভয়কে টার্গেট করে তুর্কি গেরিলারা। বেল-পুনার এবং এল-ওহগ্লু অঞ্চলে মেজর কর্ণলোপের দুটি এসকর্ট বাহিনী এম্বুশে পড়ে ধ্বংস হয়ে যায় এবং বেশিরভাগ সাপ্লাই তুর্কিদের হস্তগত হয়। ফ্রেঞ্চরা বুঝতে পারে যে এই হামলার পিছনে স্থানীয় তুর্কিরা দায়ী। তাই জেনারেল কিউয়েরেট্টে স্থানীয়দের একটি নেতৃস্থানীয় দলকে তার অফিসে ঢাকায় এবং এধরণের আচরণ আর না হওয়ার নিশ্চয়তা চায়। জবাবে প্রতিনিধি দলটির নেতা মারাশে তুর্কি পুলিশের প্রধান কর্মকর্তা আরসালান তোগুজ যে কাজটি করেন তার জন্য ফ্রেঞ্চরা মোটেও প্রস্তুত ছিল না। মিটিং থেকে বের হয়েই প্রবল সাহসের সাথে নিজের রিভলবার বের করে আকাশে পাঁচ রাউন্ড গুলি ছুঁড়েন। জেনারেলের কপালে তখন চিন্তার ভাঁজ। কেননা তুর্কিরা তার মুখের উপর যুদ্ধের ঘোষণা দিয়ে গেলো!

ছবিঃ ফরাসী আর্মেনিয়ান লিজিয়নের সেনারা।

তুর্কি অবরোধ কৌশল :

প্রথমে এসমস্ত স্থানীয় লোকদের নিয়ে গঠিত gendarmerie বাহিনীর উপর আক্রমণ করা হয়। কারণ এদের কমান্ডিং অফিসার ছিল ফরাসি। ঐসময় বিভিন্ন গ্যারিসনে প্রায় দু হাজার ফ্রেঞ্চ সৈনিক ছিল। প্রথম দফায় তাদেরকে ঝটিকা আক্রমণের মাধ্যমে পরাজিত করে তুর্কি গেরিলারা। বন্ধ করে দেয়া হয় ফরাসি সাপ্লাই লাইন। এক্ষেত্রে তুর্কি যুদ্ধ কৌশল ছিল ‘শত্রুকে বিচ্ছিন্ন করে অবরোধ দেয়া’। ফলে স্বল্প যুদ্ধেই বিজয় ছিনিয়ে আনা সম্ভব।

কিন্তু মারাশের ফ্রেঞ্চ গ্যারিসনগুলোর মাঝে সরাসরি যোগাযোগ ছিল না।এমনকি ডিভিশন হেডকোয়ার্টার থেকেও প্রত্যেকটি গ্যারিসনে কমান্ড পাঠানো সম্ভব ছিল না। ফলে তারা জানতে পারেনি যে অপরজন হামলার শিকার। আবার অবরোধে থাকা ফ্রেঞ্চরা আশা করছিল যে অচিরেই রিএনফোর্সমেন্ট আসবে।

ফলে ২১ জানুয়ারি তুর্কি হামলা ও অবরোধ শুরু হলে জেনারেল ডুফিয়েক্স ৩১ তারিখের আগে জানতেই পারেননি। তাও তথ্য পৌঁছানো সম্ভব হয়েছিল স্থানীয় আর্মেনিয়ানদের কারণে। তাদের কয়েকজন মুসলিম সেজে তুর্কিদের বোকা বানিয়ে ব্যাটল লাইন ক্রস করে সংবাদ পৌঁছান। জেনারেল সাথেসাথেই লেফটেন্যান্ট কর্নেল রবার্ট নোরমান্ডকে তিনটি ইনফেন্ট্রি, হাফ স্কোয়াড্রন ক্যাভিলারি সেনা নিয়ে পাল্টা হামলা করতে পাঠান। তিনি ছিলেন দুর্ধর্ষ এক সেনা কর্মকর্তা ও পরবর্তীতে ফ্রেঞ্চ বাহিনীর সর্বকনিষ্ঠ জেনারেল। ৭ ফেব্রুয়ারি তার বাহিনী মারাশে তীব্র আর্টিলারি হামলা শুরু করে। শুরু হয় তুমুল যুদ্ধ। এক পর্যায়ে তুর্কিরা পিছু হটতে বাধ্য হয়। তিনি জেনারেল কিউয়েরেট্টের বাহিনীকে তুর্কি অবরোধ মুক্ত করতে সক্ষম হন। জেনারেল ডুফিয়েক্স জানতেন তুর্কিরা পাল্টা আঘাত হানবে। তখন আবার রিএনফোর্সমেন্ট পাঠানো সম্ভব হবেনা। তাই তার অর্ডার ছিল দ্রুত মারাশ থেকে সমস্ত ফ্রেঞ্চ সেনাদের প্রত্যাহার করা। এদের সাথে ফ্রেঞ্চদের সাথে অনুগত স্থানীয় মুসলিম-খ্রিস্টানদের ও সঙ্গে নিয়ে আসতে বলেন তিনি। অর্থাৎ বর্তমানে শক্তি সঞ্চয় করে ভবিষ্যতে তিনি আবারও তুর্কিদের সাথে যুদ্ধ করার ইচ্ছা পোষণ করছেন। ঠিক তখনই তুর্কিরা যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব দেয়। জেনারেল কিউয়েরেট্টে কি করবেন ভেবেই পাচ্ছেন না। শেষ পর্যন্ত তিনি পিছু হটার সিধান্ত নেন। কিন্তু তার আগে ১১ ফেব্রুয়ারি সকালে নিজেদের অবশিষ্ট গোলাবারুদ যা ছিল সব ধ্বংস করে ফেলেন! ফলে জেনারেল ডুফিয়েক্স যে কারণে পিছু হটতে বলেছিলেন সেই আশা দুরাশায় পরিণত হলো। তিনি ভবিষ্যতের যুদ্ধের জন্য কেবল সেনা পেলেন, অস্ত্রশস্ত্রের ঘাটতি আরো প্রকট আকার ধারণ করলো। অথচ জেনারেল কিউয়েরেট্টে তুর্কিদের যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব মেনে নিলে কিন্তু তিনি সুবিধাজনক অবস্থানে থাকতেন।

ছবিঃ তুর্কি গেরিলাদের একাংশ।

যুদ্ধবিরতি না মানায় তুর্কিদের ভয়ে তাকে রাতের অন্ধকারে পালাতে হয়েছে। তিনদিনে মাত্র ১২১ কিঃমিঃ পথ পাড়ি দিতে তার সঙ্গী ৩ হাজার আর্মেনিয়ানের মধ্যে প্রায় হাজার খানেক ঠাণ্ডা-ক্ষুধায় মারা যায়। এসময় ফ্রেঞ্চ সেনা কেমন মারা গিয়েছিল তা সম্পর্কে কোনো তথ্য জানা যায় না। তবে যুদ্ধে ১৬০ জন নিহত, ১৭০ জন নিখোঁজ, ২৮০ জন আহত হয়েছিল। এছাড়া যুদ্ধ ও পালানোর সময় প্রায় ৩০০ জন ফ্রস্টবাইট (তীব্র ঠাণ্ডায় অঙ্গপ্রত্যঙ্গ বরফ হয়ে যাওয়া) এর শিকার হয়েছিল। অন্যদিকে তুর্কিদের পক্ষে প্রায় ৪,৫০০ নিহত, ৫০০ এর বেশি আহত হয়েছিল। এছাড়া পুরো যুদ্ধে আর্মেনিয়ান বেসামরিক হতাহতের সংখ্যাটি আনুমানিক ৫ থেকে ১২ হাজারের মতো।

 

 

আর্মেনিয়ান গণহত্যাঃ

মারাশের যুদ্ধে ফ্রেঞ্চদের পক্ষ নিয়ে তুর্কিদের আরেক দফা রোষের শিকার হয় আর্মেনিয়ানরা। তুর্কিবাহিনীর বেশিরভাগই ছিল গেরিলা যোদ্ধা। এদের মাঝে সামরিক পেশাদারিত্ব, নৈতিকতা ও চেইন অফ কমান্ডের বালাই ছিল না। ফলে ছোট ছোট ইউনিটগুলোর উপর তুর্কি সেনা কর্মকর্তাদের নিয়ন্ত্রণ ছিল না। কুর্দিশ, চেরকিশ ও তুর্কিশ উপধারার কিছু গোত্রের গেরিলাদের হাতে ব্যাপক হারে আর্মেনিয়ান নিধন হয়। অভিযোগ রয়েছে যে জেনারেল মোস্তফা কামাল পাশা গণহত্যা বন্ধে তেমন কোনো শক্ত পদক্ষেপ নেননি। আবার কতজন আর্মেনিয়ান আসলে মারা গেছে সেই পরিসংখ্যানও সঠিক জানা যায় না। বিভিন্ন রিপোর্ট অনুযায়ী সংখ্যাটি ১৬ হাজার বলে জানা যায়। পরবর্তীতে আরো তদন্ত করে একে পাঁচ থেকে বারো হাজার বলে দাবি করা হয়। একজন জার্মান সার্জনের ভাষ্য অনুযায়ী সেইন্ট স্টিফেন চার্চের আশেপাশে প্রায় তিন হাজার আর্মেনিয়ান নিহত হয়েছিল বলে জানা যায়।

তখন লন্ডন কনফারেন্সে মিত্রবাহিনীর সুপ্রিম কাউন্সিলের সাথে অটোমান সরকারের শান্তিচুক্তির আলোচনা হচ্ছিলো। তারা ফ্রেঞ্চ বাহিনীর পরাজয়ের খবরে হতভম্ব হয়ে যায়। ফরাসীরা নিজেদের পিঠ বাঁচাতে আর্মেনিয়ান গণহত্যাকে তেমন গুরুত্ব দিয়ে প্রকাশ করেনি। কিন্তু মার্কিন ও ইউরোপিয়ান সংবাদপত্রগুলো সেটি ফলাও করে প্রচার করতে থাকে। ব্রিটিশ পার্লামেন্ট এই ঘটনার নিন্দা করে। মিত্রবাহিনী কামাল আতাতুর্কের সামরিক শক্তি সম্পর্কে গোয়েন্দা তথ্য সংগ্রহে পিছিয়ে ছিল। ফ্রেঞ্চ তদন্তে হারের পিছনে দুর্বল রেডিও কমিউনিকেশন সিস্টেমকে দায়ী করা হয়েছিল। মিত্রবাহিনী এবার অটোমান সরকারকে কামাল পাশাকে বহিস্কার এবং দেশদ্রোহী হিসেবে আখ্যা দিতে চাপ দিতে শুরু করে। এরপর ১৬ মার্চ, ১৯২০ সালে রাজধানী কন্সটান্টিনোপল দখল করতে সেনা পাঠায়। ফলে পুরোদমে শুরু হয় তুরস্কের স্বাধীনতার যুদ্ধ যার ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপিত হয়েছিল মারাশে। যুদ্ধের পর ১৯২৫ সালে শহরটির বাসিন্দাদের স্বাধীনতা পদক দিয়ে সম্মানিত করে তুরস্ক।

ছবিঃ ধরা পড়া কামাল পাশার বাহিনীর সেনাদের মৃত্যুদণ্ড দিচ্ছে ব্রিটিশরা।

Add a Comment

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।